বর্ষাকালে স্কিনের প্রবলেম অতিরিক্ত বেড়ে যায় তার প্রধান কারণ হলো আদ্র আবহাওয়ায় বিভিন্ন ছত্রাকের বংশ বৃদ্ধি। বিশেষ করে যারা বেশি জলের কাজকর্ম করেন অর্থাৎ মহিলাদের ক্ষেত্রে এই ছত্রাক আক্রমণ বেশি হতে দেখা যায়। অনেকেরই কাছে শুনতে পারা যায়, হাতে ও পায়ে একজিমা, হাজা, দাদ, চুলকানির মতন বিভিন্ন সংক্রমণ হয়েছে। এগুলো মূলত ছত্রাক জাতীয় সংক্রমণ বলা হয়ে থাকে। অনেক রকম ওষুধপত্র বা মলম লাগিয়েও একদম নিরামূল হয় না, এই ছত্রাক সংক্রমণ। তবে আজকের এই প্রতিবেদনে কিছু আয়ুর্বেদিক টোটকা আপনাদেরকে জানাবো যেগুলি মেনে চললে খুব সহজেই এই ছত্রাক সংক্রমণ থেকে আপনি চিরতরে মুক্তি পাবেন।
কখন গুরুতর হবে ছত্রাক সংক্রমণ?
বিশ্বের যে সমস্ত জটিল ও কঠিন দূরারোগ্য রোগ রয়েছে তাদের মধ্যে ছত্রাক সংক্রমণ কিছুটা উপেক্ষিত রোগ বলেই মনে করা হয়। এর প্রধান কারণ হলো যেহেতু ছত্রাক সংক্রমনের ফলে শুধুমাত্র স্কিনের ক্ষতি হয় কিন্তু খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য শারীরিক দিকগুলি অক্ষত থাকে তাই এই দিক নিয়ে অনেকেই মাথা ঘামায় না। কিন্তু অনেকেই জানেন না দীর্ঘদিন ধরে যদি চামড়ার ছত্রাক সংক্রমণ আপনি উপেক্ষা করে চলেন তাহলে কিন্তু ত্বকের সংক্রমণ ধীরে ধীরে মারাত্মক আকার এমনকি প্রাণঘাতী আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে যাদের দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে তাদেরকে আরো বেশি করে সংক্রামিত করবে এই ছত্রাক। তার জন্য সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা উচিত এবং ছত্রাক সংক্রমণ হলে সেটিকে ফেলে না রেখে বা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা করা উচিত। অনেকেরই ভয় থাকে অ্যালোপ্যাথি ওষুধ খেলে সংক্রমণ আরো বেড়ে যেতে পারে বা অন্য কোন ক্ষতি হতে পারে তার জন্য আপনি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার শরণাপন্ন হতে পারেন।
আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ছত্রাক সংক্রমনে গুরুত্বপূর্ণ কেন?
আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার মাধ্যমে ছত্রাক জনিত রোগ গুলোকে খুব ভালো করে বোঝা এবং গভীর পর্যন্ত চিকিৎসা করা সম্ভব হয়। বিশেষ করে দেহের সার্বিক পরিচ্ছন্নতা এবং পরিষ্কারের ওপর জোর দেওয়া হয় যার ফলে টিস্যুর স্থিতিস্থাপকতা ঠিক হয়ে যায়।
বর্ষাকাল বা আদ্য জলবায়ুতে ছত্রাকের ব্যাপক বংশবিস্তার ঘটে এবং যে কোন ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যদি কম থাকে দুর্বল থাকে বা চামড়ায় ক্ষত থাকে তাহলে সেই ছত্রাক খুব সহজেই সেই স্থানকে আক্রমণ করে। এই ছত্রাক মানবদেহের ত্বক এবং অভ্যন্তরীণ ঝিল্লিতেও বসবাস করতে পারে। এছাড়া কেউ যদি বেশিরভাগ সময় জলের মধ্যে কাজ করে, আটোসাটো সিন্থেটিক পোশাক পরিধান করে, যাদের অতিরিক্ত ঘাম হয় এবং দুর্বল স্বাস্থ্য বিধি রয়েছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাব রয়েছে তাদেরকেই এই সমস্ত ছত্রাক জনিত সংক্রমণে শিকার হতে হয়। এর কারণ এই সমস্ত কারণের ফলেই ছত্রাকের জীবাণু অনুকূল পরিবেশ পায় তাদের বংশবৃদ্ধি করার জন্য। প্রায়শই শোনার যায় তাদের হাতে পায়ে ফুসকুড়ি, লালচে ভাব, জ্বালা ও অন্যান্য আরো ত্বকের সমস্যার সৃষ্টি হয়। এছাড়া অস্ত্রোপচার আঘাত এবং পুড়ে যাওয়া ত্বকের গভীরে এই ছত্রাক সৃষ্টিকারী জীবগুলি আরো সুগম পথ তৈরি করে বংশবিস্তারের জন্য।
Read more: দিল্লিতে কালবৈশাখীর তাণ্ডব! ঝড়-বৃষ্টিতে স্বস্তি, কিন্তু বিমান পরিষেবায় বড় প্রভাব।
ছত্রাক সংক্রমণ আরো মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে যদি কোন ব্যক্তির অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকে বা কোভিড আক্রান্ত ব্যক্তিদের ত্বকে ছত্রাক সংক্রমণ অনেক সময় আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। অনেক সময় এই সংক্রমণ অক্ষীকোটরে ছড়িয়ে পড়ে। তখন দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, প্রোপটোসিস অর্থাৎ চোখ বেরিয়ে আসার মতন অবস্থা এবং নাক ও চোখের গোড়ায় কালো ক্ষত সৃষ্টি হয়।
ছত্রাক সংক্রমনের লক্ষণ:
সাধারণ ছত্রাক সংক্রমনের লক্ষণ হিসেবে ফুসকুড়ি, লালচে ভাব, ত্বকের মধ্যে জ্বালা ভাব ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয়। এটি আরো গুরুতর হলে ত্বকের মধ্যে ঘা, গোলাকার সাদা হয়ে যাওয়া এবং সেখান দিয়ে পুঁজ বের হয়। এছাড়া দাদ হাজা চুলকানি এ সমস্ত চর্মরোগ প্রায়শই শোনা যায়। এগুলো মুখে এবং যৌনাঙ্গ হতে পারে। এছাড়া অনিকোমাইকোসিস বা নখের মধ্যে ছত্রাক সংক্রমণের কারণে অনেক সময় নখ পুরু, বিবর্ণ এবং ভঙ্গুর হয়ে যেতে দেখা যায়।
সিস্টেমিক সংক্রমণ আরো গুরুতর আকার ধারণ করে যখন যেমন মুখমণ্ডলে ব্যথা, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, মুখের একদিক ফুলে যাওয়া, চোখে ব্যথা ও দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়ার মতন লক্ষণ দেখা যায়।
আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতি:
আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা মূলত রোগের উৎপত্তি লক্ষণ এবং তার নির্মূল প্রক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন চর্মরোগের জন্য ত্রিফলা কষায় বা নিম পাতার নির্যাস খুবই উপকারী এবং এগুলি আধুনিক ফার্মাকোলজি দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে।
আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে শরীরের বা ত্বকের অভ্যন্তরীণ টিস্যুর ক্ষত দূর করতে এবং টিস্যুর বিপাক ক্রিয়া বৃদ্ধি করতে, সেই সাথে বিষাক্ত পদার্থ দূর করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে যে উপাদানগুলি ব্যবহার করা হয় সেগুলি হল ক্রিমিগ্ন বটি, জীবন্তি চূর্ণ এবং অশ্বগন্ধা চূর্ণ। এগুলি অ্যান্টিফাঙ্গাল হিসেবে কাজ করে।
মিউকরমাইকোসিসের মতো ছত্রাক যখন চোখে সংক্রমণ ঘটায়, তখন চোখের আক্রান্ত স্থানে সুনেত্রা আই ড্রপস এবং আই প্লাস-এর মতো আয়ুর্বেদিক সহায়ক ঔষধ দেওয়া হয়। এরপরে চোখের প্রদাহ কমে যায় এবং টিস্যুর নিরাময় হয়। অনু তৈল নামক একটি ভেষজ নাসিকা তেল সাইনাস পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। এছাড়া এবং মস্তিষ্ক বা অক্ষিকোটরের মতো গভীরতর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রোগজীবাণুর প্রবেশে বাঁধা প্রদান করে।
খাদ্যাভাস ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা:
ছত্রাকের সংক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে কিছু অভ্যাস আমাদের গড়ে তুলতে হবে তার মধ্যে প্রধান হল পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। রোজ ভালো করে স্নান করা দরকার এবং যদি স্নানের জলে ত্রিফলা বা নিমপাতা দিয়ে স্নান করা হয় তাহলে অনেকটাই উপকার পাওয়া যায়। ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরিধান করা উচিত যাতে বায়ু চলাচল করতে পারে। আবদ্ধ জুতো গরমকালে বা আদ্র আবহাওয়ায় না পড়াই ভালো। হাত-পা জল দিয়ে ধোঁয়া সাথে সাথে মুছে ফেলা উচিত অর্থাৎ শুষ্ক রাখা উচিত। নখ কাটার নেই কাটার বা ব্লেড সবসময় নিজের হওয়া উচিত।
অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার এবং দুগ্ধ জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন হলুদ, রসুন, নিমপাতা নির্যাস খাওয়া উচিত।
কখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন?
ছত্রাক সংক্রমণ যদিও ত্বকের উপরিভাগে বা বহির্ভাগে প্রথমে পরিলক্ষিত হয় তাই কয়েকদিন দেখার পর যদি প্রাকৃতিক ঔষধ বা টোটকায় আপনার না সাড়ে তাহলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডার্মাটোলজিসের কাছে যান এছাড়া আয়ুর্বেদিক ডাক্তারের কাছেও আপনি যেতে পারেন। বিশেষ করে যখন এই ছত্রাক সংক্রমণ চোখ, মস্তিস্ক, ফুসফুসের মতন অংক গুলোতে আক্রমণ করে এবং যার জন্য জ্বর,দুর্বলতা, মাথা ব্যাথা, ক্লান্তি অনুভব হয় তখন অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যাওয়াই ভালো। এছাড়া সবসময়ই চেষ্টা করবেন ভেজা হাত-পা শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে ফেলার এবং সুতির পোশাক পরিধান করা এবং সর্বোপরি নিজের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।